কষ্ট, যন্ত্রণার হাঁটু ও শেষ বিশ্বকাপ

মাশরাফি বিন মর্তুজা একজন ক্রিকেটার সেই সাথে নব্য সংসদ সদস্য। দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তিনি কোটি ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। বিশ্বকাপের মাঠ কাঁপাতে মাশরাফি পুরোটিম সদস্যদের নিয়ে এখন ইংল্যান্ডে।

গতকাল (২৮ মে) নিজেদের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচ হার দিয়ে শুরু করেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের সাথে প্রথম খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে সে ম্যাচ বাতিল ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে ৯৫ রানে ভারতের কাছে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। কিন্তু এ হার নিয়ে হতাশ নন টাইগার দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা। তার মতে, দলের প্রস্তুতি যথেষ্ট হয়েছে।

সম্প্রতি মাশরাফি বিন মর্তুজা গণমাধ্যমকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, কষ্ট, যন্ত্রণার হাঁটু ও শেষ বিশ্বকাপ নিয়ে।

মাশরাফির সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ সংবাদ মাধ্যমের বারাত দিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে:-

এ পৃথিবীতে একটি বেদনার শহরও আছে তাঁর। যে শহরে বারবার গেছেন; কিন্তু কখনোই আনন্দের স্মৃতি নিয়ে ফেরা হয়নি। যা যা নিয়ে ফিরেছেন, সেসব শুধুই মাশরাফি বিন মর্তুজার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে গেছে। সেখানে বেশির ভাগ সময়ই গেছেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে, নয়তো ক্রাচে ভর দিয়ে। ফেরার সময়ও কতবার ক্রাচ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী! একেবারে সুস্থ-সবল অবস্থায় যে কয়বার গেছেন, তাও নিষ্ঠুর শহরের পাষাণ হৃদয় গলেনি। প্রথম অধিনায়ক হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে যাওয়া মাশরাফির না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস ভারী করে আসা সেই শহরের নাম মেলবোর্ন।

তাঁর চোটগ্রস্ত দুই হাঁটু যেখানে বারবারই গেছে ডাক্তার ডেভিড ইয়াংয়ের ছুরি-কাঁচির নিচে। একই শহরে ২০১৫ বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে গিয়ে ভাবছিলেন কেড়ে নেওয়ার শহর এবার যদি কিছু ফিরিয়ে দেয়! যদি কানায় কানায় ভরিয়ে দেয় প্রাপ্তির পেয়ালাও! কিন্তু তা আর হয়েছে কই? হয়নি বলেই অনিন্দ্যসুন্দর মেলবোর্নও তাঁর কাছে রুক্ষ মরুভূমি হয়েই থেকেছে, ‘গত বিশ্বেকাপে মেলবোর্নে দুটি ম্যাচ খেললাম। একটি কোয়ার্টার ফাইনাল, আরেকটি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে গ্রুপ ম্যাচ। যে ম্যাচ জিতলে হয়তো আমরা আরো আগেই চলে যেতাম কোয়ার্টার ফাইনালে। চিন্তা করলাম, এই মেলবোর্নে এসে জীবনে কত কষ্ট পেয়েছি। এখানে কত অস্ত্রোপচার হয়েছে, কত কষ্টের ভেতর দিয়ে গেছি! ভেবেছিলাম এ মেলবোর্ন নিশ্চয়ই এবার একটি আনন্দের মুহূর্ত দেবে। কিন্তু দেয়নি তো।’

আনন্দের মুহূর্ত না দিলেও ক্রিকেট ক্যারিয়ার-পরবর্তী জীবন নিয়ে আগাম টেনশন উপহার দিয়েছে ঠিকই, ‘‘মেলবোর্নে গিয়ে ভাবলাম ডেভিড ইয়াংয়ের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। একদিন গেলামও। গিয়ে শুনে এলাম, ‘৪৫-৫০ বছর বয়সে তোমাকে কিন্তু হুইলচেয়ারে বসতেই হবে।’ অবশ্য সেই পরিণতি যাতে না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথাও বলেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন ক্যারিয়ার শেষে যেন ‘নি রিপ্লেসমেন্ট’ (নকল হাঁটু বসিয়ে নেওয়া) করিয়ে নিই।’’ একই ডাক্তারের কাছ থেকে বছরখানেক আগে যা করিয়ে নিয়েছেন ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় সনাৎ জয়াসুরিয়াও। যাঁর হাঁটায় অক্ষমতার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছিল বেশ।

‘মাতারা হারিকেন’-এর সঙ্গে নিজের অবস্থা তুলনায় ক্যারিয়ার শেষে আরেকটি অস্ত্রোপচারকে অবশ্যম্ভাবীই মনে হচ্ছে মাশরাফির, ‘‘জয়াসুরিয়ার কিন্তু হাঁটুর চোট ওরকম ছিল না। এরপরও কিন্তু উনার একটি হাঁটুতে ‘নি রিপ্লেসমেন্ট’ করতে হয়েছে। আমার তো দুই হাঁটু মিলিয়েই অস্ত্রোপচার হয়েছে সাতবার। যাঁদের অস্ত্রোপচার অনেকগুলো হয়, তাঁদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নকল হাঁটু বসানোর প্রয়োজন পড়তে পারে। আমার ক্ষেত্রে যে অবস্থা, তাতে ক্যারিয়ার শেষে এটি মোটামুটি অবধারিত বিষয়ই হয়ে আছে।’’ নিজেই যখন বলে দিয়েছেন যে ইংল্যান্ডেই শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন এবং এরপর ক্যারিয়ারও আর খুব বেশি দীর্ঘায়িত করবেন না বলে সাধারণ ধারণা, তখন নকল হাঁটু বসানোর সময়ও ঘনিয়ে আসছে বলা যায়। এর আগে বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়কের ভাগ্যে কী লিখে রেখেছে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ? অভূতপূর্ব কোনো সাফল্যের আশা আছে মাশরাফিরও। কিন্তু ভাগ্যে পরম বিশ্বাসী এই পেসার আবার শত চেষ্টায়ও ভাগ্য বদলানো যায় বলে মনে করেন না, ‘আপনি যদি কিছু পান, সেটি আপনার ভাগ্যবদল নয়। আমি মনে করি, সেটি নির্ধারিতই আছে।’

২০১৪-র শেষে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঘোর দুঃসময়ে আবার নেতৃত্ব ফিরে পাওয়া অধিনায়কের একের পর এক সাফল্যও তাহলে নির্ধারিতই ছিল। দর্শনের এই ছাত্রের কথা মানলে নির্ধারিত হয়ে আছে তাঁর শেষ বিশ্বকাপের ভাগ্যও। বেদনার শহরে বিলীন এই ক্রিকেটারকে প্রাপ্তির দুই কূল উপচানো ঢেউ ভাসিয়ে নিচ্ছে কি না, সেটি জানতে তাই আপাতত অপেক্ষাই শেষ কথা!

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *